ন্যাভিগেশন মেনু

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রথম ১০০ দিন যেসব বিষয়ে নজর দেবেন


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় বসার প্রথম দিন থেকেই বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রথম দশদিনেই তিনি বেশ কিছু নির্বাহী আদেশ জারির কাজ শুরু করছেন।

বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরেছে। এগুলো হলো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে জারি করা নির্বাহী আদেশ, যার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।

এই তালিকায় সবার উপরে আছে দুটি বিষয়। প্রথমত- বিতর্কিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বাতিলের বিষয়। তার পূর্বসূরী ডোনাল্ড ট্রাম্প নিরাপত্তা হুমকির কারণ দেখিয়ে প্রধানত যেসব মুসলিম দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, সেগুলো প্রত্যাহার করা। আর দ্বিতীয়টি হলো - প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবারও ফিরে আসা।

এছাড়াও নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে যে বিষয়গুলোর দিকে তিনি অবিলম্বে নজর দিতে চান বলে জানা যাচ্ছে সেগুলো হলো - করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলা, আমেরিকানদের মাস্ক পরানো।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪ লাখের বেশি মানুষ। এই মহামারি এবং দেশটিতে এর সূদুরপ্রসারী প্রভাব মোকাবেলা নতুন প্রশাসনের অগ্রাধিকারের তালিকায় সবার উপরে থাকবে।

বাইডেন বলেছেন 'আমাদের প্রশাসনের জন্য এটা অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই' এবং তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর সাথে সাথেই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় তার কৌশল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তার প্রথম একটি পদক্ষেপ হবে দেশব্যাপী কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত ভবনে এবং আন্তঃরাজ্য ভ্রমণের সময় মাস্কপরা বাধ্যতামূলক করে নির্বাহী আদেশ জারি করা। যদিও সারাদেশে মাস্কপরা বাধ্যতামূলক করার জন্য আদেশ জারি করার কোন আইনগত পথ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় কার্যত দেওয়া নেই। তবে, প্রথম দিনে জারি করা নির্বাহী আদেশে তিনি ফেডারেল অফিসগুলোতে মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বাইডেন টিকাদান প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চার করতে চান। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হল তার ক্ষমতায় প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দশ কোটি মানুষকে করোনার টিকার অন্তত প্রথম ডোজ দিয়ে দেওয়া।

এছাড়াও দ্রুত কোভিড পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু ও তা উন্নত করতে, এবং জাতীয় স্তরে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, এবং পিপিই-র সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর রাখার জন্যও তিনি নির্বাহী পদক্ষেপ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিয়ে ফের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগদানের  প্রতিশ্রুতিও তার কার্যতালিকায় রয়েছে। এ ব্যাপারে নির্বাহী আদেশ এরই মধ্যে জারি করেছেন তিনি

বাইডেনের প্রশাসনিক টিমের সদস্যরা বলেছেন, বাসা ভাড়া না দিতে পারার জন্য ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ বা বাড়ি কেনার বন্ধকের অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে বাড়ি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার মেয়াদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা জো বাইডেনের রয়েছে। মহামারি শুরু হবার পর এই স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছিলো।

এ ছাড়াও সরকারের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে শিক্ষার্থীদের দেওয়া ঋণের কিস্তি সুদসহ পরিশোধের প্রক্রিয়াও এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। সেটিও চালু রাখতে চান বাইডেন।

বাইডেনের টিম আরও জানান, শ্রমজীবী পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারেও অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ক্যাবিনেট সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তিনি নির্দেশ দেবেন এমন পরিকল্পনা রয়েছে।

তাছাড়া, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিপর্যস্ত আমেরিকান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য গত সপ্তাহে বাইডেন ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন এবং বলেছেন, মানুষের দুঃসহ মাত্রার দুঃখকষ্ট যে একটা সংকটময় পরিস্থিতে পৌঁছেছে, তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এবং এখন নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই।

এই প্যাকেজ কংগ্রেস অনুমোদন করলে তা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে বলে বাইডেন মনে করছেন। স্কুল নিরাপদে খোলার জন্যও এই প্যাকেজে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। বাইডেন তার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে নিরাপদ পরিবেশে স্কুল আবার চালু করতে আগ্রহী।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনায় শুধু কোভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য অর্থ সহায়তার প্রস্তাবই রাখেননি। মি. ট্রাম্প যে কর ছাড় দিয়েছেন তা বাতিল করার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন।

ট্রাম্প তার ক্ষমতার প্রথম দিকে ২০১৭ সালে যে কর ছাড় অনুমোদন করেন, বাইডেনের টিম বলছে সেটা শুধু ধনী আমেরিকানদের পকেট ভারী করেছে। ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা এই ছাড়ের সুবিধা মোটেও পাননি, এই সুবিধা ভোগ করেছেন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া, বাইডেন ব্যবসার মাধ্যমে বিদেশ থেকে অর্জিত অর্থের ওপরও কর বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন।

জো বাইডেন বলেছেন ক্ষমতা গ্রহণ করার পর প্রথম দিনই তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আমেরিকাকে আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই চুক্তিতে বিশ্ব নেতারা পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন, যেটা ছিল শিল্পায়নের আগের বিশ্বের তাপমাত্রা। তারা অঙ্গীকার করেছিলেন সম্ভব হলে তাপমাত্রা তারা ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নামিয়ে আনার চেষ্টা করবেন।

ট্রাম্প ২০১৫ সালে সম্পাদিত ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। আমেরিকা ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা বিশ্বের প্রথম দেশ।

কানাডার আলবার্টা প্রদেশ থেকে মনটানা আর সাউথ ডাকোটার মধ্যে দিয়ে টেক্সাস পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন বসানোর এক বিতর্কিত প্রকল্পও তিনি ক্ষমতা হাতে নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বাতিল করে দেবেন এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিস্টোন এক্সএল নামে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন বসানোর এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেবার জন্য ২০১৭ সালে একটি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প সই করার পর থেকে বিরোধীরা এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আসছেন গত কয়েক বছর ধরে।

যানবাহনের কার্বন নিঃসরণের মাত্রা শিথিল করে ট্রাম্প প্রশাসন যে আইন পাশ করেছিল সেটি নিয়েও নতুন করে চিন্তাভাবনার কথা বলেছেন বাইডেন। তিনি বলেছেন, গাড়ি ও ভারী যানবাহনের কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্রে শিগগিরি কঠোর বিধিনিষেধ আনা হবে।

২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করার মাত্র সাতদিনের মাথায় ট্রাম্প কিছু দেশ থেকে আমেরিকায় ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ট্রাম্পের যেসব নীতি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই বাতিল করেছেন বাইডেন।

সাতটি মূলত মুসলিম প্রধান দেশ থেকে আমেরিকায় ভ্রমণের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, পরে আদালতে এই বিধান চ্যালেঞ্জ করে মামলা চলার পর তালিকায় কিছু রদবদল করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, ভেনেজুয়েলা এবং উত্তর কোরিয়া।

অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে বাইডেনের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি হলো তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকেই কংগ্রেসে একটি বিল উত্থাপন করবেন, যার মাধ্যমে নথিবিহীন এক কোটি দশ লাখের ওপর অভিবাসীকে নাগরিকত্ব দেওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে বাইডেন ঘোষণা করেছেন, আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্তে যে ৫৪৫ জন অভিবাসী শিশু তাদের বাবা-মায়েদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে তাদের একত্র করার জন্য তিনি একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করবেন।

তাছড়া, ট্রাম্পের প্রকল্প আমেরিকা আর মেক্সিকোর মাঝখানে দেওয়াল তোলার কাজও বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বাইডেন। শপথ নেয়ার পরপরই জারি করা নির্বাহী আদেশে তিনি এই প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।

কোভিড-১৯, অর্থনীতি এবং জলবায়ুর পর চতুর্থ স্থানে রয়েছে বর্ণবাদের সমস্যা। বাইডেন বলেছেন, তিনি দ্রুত এই সমস্যা মোকাবেলার কাজ শুরু করবেন। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবাসহ যেসব ক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্য প্রকট সেসব ক্ষেত্রকে তিনি অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

প্রথম ১০০ কার্যদিবসের মধ্যে বাইডেন পুলিশ বিভাগের সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি পুলিশের কার্যকলাপের ওপর নজরদারির জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সংস্থা গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এই পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এলজিবিটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছেন বাইডেন। তিনি বলেছেন হিজড়া, তৃতীয় লিঙ্গ ও সমকামীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে তিনি তহবিল বরাদ্দ করবেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা তিনি প্রত্যাহার করবেন এবং স্কুলে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে বৈষম্য বন্ধে নির্দেশাবলী জারি করবেন। এ বিষয়ক নির্বাহী আদেশও তিনি এই মধ্যে জারি করেছেন।

নতুন প্রেসিডেন্ট বলেছেন আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর সাথে তিনি দ্রুত যোগাযোগ করবেন, বিশেষ করে যাদের সাথে গতকয়েক বছরে আমেরিকার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে এবং 'আমেরিকা তাদের পেছনে রয়েছে' এই প্রতিশ্রুতি তাদের দেবেন।

> যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন জো বাইডেন

> যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন কমলা হ্যারিস

এডিবি/