NAVIGATION MENU

বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির ভাষা আন্দোলন


বঙ্গবন্ধুই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের আন্দোলন করে গড়ে তুলেছিলেন। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির নিজেদেরকে টের পেয়ে নেওয়া আন্দোলন, তখন বাঙালি ৪.২১ কোটির মতো থাকলেও জীবিত বাঙালি ছিল কয়জন? অধিকার বিহীন মানুষদেরকে মানুষ বলা গেলেও জীবিত কিংবা বাঙালি বলা অগৌরবের হয়। যেহেতু ইতোমধ্যে বাঙালি মরতে শিখে গিয়েছিল তাও ভীরুর মতো নয়, বীরের মতো বুক পেতে দিয়ে মরতে শিখে গিয়েছিল। মৃত বাঙালি যেভাবে জীবিত হয়ে উঠতে শিখে গিয়েছিল আত্মার আত্মোপলব্দিতে, তাতে তাঁদের আর দাবায়ে রাখা সম্ভব ছিল না। 

বঙ্গবন্ধু তাঁর কথোপথনে, ভাষণে, বিবৃতিতে জনগণকে কথা দিয়েছিলেন, শহীদের এক ফোঁটা রক্ত ও বৃথা হয়ে যেতে দিবেন না। তাই ভাষার জন্য সালাম রফিক বরকতসহ বাঙালির সেদিনের সেই মৃত্যু বৃথা হয়ে যায় নাই, যেমন বৃথা হয়ে গিয়েছিল করাচির ছাত্রদের মৃত্যু, পাঞ্জাবে ছাত্রদের মৃত্যু, আসামে জনতার মৃত্যু। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ওয়াদা অনুসারে তাঁর বাঙালি ছাত্রদের মৃত্যু বৃথা হয়ে যেতে দেওয়া হয় নাই, বা হয়ে যেতে দেননি। 

দেওয়া হয় নাই বা দেননি এই অর্থে বলব, কারণ পৃথিবীর যে কোন হত্যাকাণ্ড প্রতিবাদ বিহীন হয়ে গেলে সে মৃত্যু আর মানুষের মনে থাকে না। পৃথিবীর কোন প্রতিবাদ ইয়াতিমভাবে বা অভিভাবকহীনভাবে গড়ে উঠে নাই, কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নেওয়া লেগেছে, আর তখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ করতেন কেবল একজনই, অনেকে নেতৃত্বে থাকলেও প্রতিবাদ হতো বঙ্গবন্ধুর মনে। তাঁর প্রতিবাদ শুনে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের কর্তব্যে বা তাঁকে অনুসরণে সামনে আসা লাগত।  

২৭ ফেভ্রুয়ারি ১৯৫২ জেল থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর মুক্তির পর একটু সুস্থ হয়ে উঠতে না উঠতেই ২৭শে এপ্রিল তিনি ঢাকা বার এ্যাসোসিয়েশনে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সম্মেলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে সারা পূর্ব বাংলার পাড়া-মহলা- লেন-টাউন-গ্রাম-হাটে-পথে-প্রান্তরে সংগঠন বুনে যেতে লাগলেন আর মানুষের চোখে চোখ দিয়ে জানিয়ে দিয়ে যেতে লাগলেন পশ্চিম পাকিস্তানে বসে থাকা তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা, রাজবন্দিদের উপর সরকারের জুলুম, অশুভ জমিদারী প্রথা, দুর্ভিক্ষাবস্তা, চাপানো কর্ডন সিস্টেম, অন্যায্য বিপিসি সিস্টেম, অপশাসনসহ অনেক ধরনের শোষণ এবং সর্বপরি রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতি বাঙালিদের আদায় করে নিতে হবে।

তিনি তাঁর ১৯৫২ এর কারামুক্তির পর মে মাসের শেষেরদিকে করাচীতে ও লাহোরে যান, সেখানে তিনি প্রেস কনফারেন্সে প্রথমেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন, তুলে ধরেন রূপ রেখাসহ বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষায় অন্তর্ভুক্তি করনের দাবী,- তার অংশ বিশেষ ছিল এরকম- 

'Ever since the creation of Pakistan the people of Pakistan have been making persistent demand of making Bengali as one of the state languages it being the mother-tongue of 45 millions people of Pakistan. We made it quite clear that we are not averse to Urdu, on the contrary we have been advocating sincerely that for mutual understanding and goodwill, the people of east Pakistan must learn Urdu and those of West Pakistan, Bengali. But the ruling clique in Pakistan has been insisting on destroying the language of the people of East Pakistan, and in their attempt to do so have introduced Arabic scripts into Bengali. They contend that Bengali is a Sanskritised Hindu language and the language of Hindu culture. This betray their utter ignorance about the origin and the history of the language. 

To enter into a discussion as to how far Bengali language has been the creation of the Muslim rulers, poet, people, and how far they enriched the language and literature would be to recount the entire history of the last five centuries and I would refrain from entering into such a long discussion. Suffice it to say, that there is absolutely no sense in saying that Bengali is the language of Hindus. This bogey has been raised by person who do not even know the very alphabetic of the language and who are following the footsteps of their erstwhile master- the Britisher who replaced Persian, the language of the Muslim by English and turned the Muslim community into a host of drawers of water and hewers of wood. 

in the year 1948, Khawaja Nazimuddin, the then Prime Minster of East Pakistan during the first State Language movement entered into a written agreement with the committee of Action to give Bengali the status of state language along with Urdu. But the same gentleman, while making of a speech at Dacca Maidan on the 27th of January, threw his pledge to the wind and declared that Urdu shall be the only State Language of Pakistan. Thus creates terrible resentment in the mind of the people particularly the intelligential who had suffered during the 1948 movement. You are certainly aware of that followed thereafter and how several valuable lives were lost before the bullets of the Nazimuddin government.’ 

[(Sheikh Mujibur Rahman -Karachi, 30 may 1952) Secret Document Of Intelligence Branch on Father Of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, vol-2, page- 217]

বঙ্গবন্ধু সুযোগ পেলেই চেয়েছেন তাঁর নিরীহ বাঙালিদের মনের গোপন ইচ্ছাটুকু অর্থাৎ বাংলা ভাষার ব্যবহারকে সামনে নিয়ে আসতে, আর সেটি তিনি নানা উপায়ে প্রয়োগ করেছেন। ভাষা আন্দোলনের পর পরেই তরুণ জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিব

ভাষা আন্দোলনের পর পরেই তরুণ জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে পিস কনফারেন্স অব দি এশিয়ান এন্ড প্যাসিফিক রিজিওন্স-এ পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে নয়াচীন সফর করেন। 

সেখানে অনেকে ইংরেজিতে বক্তৃতা করলেও সেখানে তিনি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। এবং তাঁর বাংলা ভাষার এ ভাষণটি ছিল দেশের বাইরে  অবাঙালি ভূখণ্ডে প্রথম কোন বাঙালির বাংলা ভাষণ। সেই ভ্রমণের একজায়গায় তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এভাবে-

"আমাদের সভা চললো, বক্তৃতা আর শেষ হয় না। এত বক্তৃতা দেওয়ার একটা কারণ ছিল। প্রত্যেক দিন সভায় যে আলোচনা হয় এবং যারা বক্তৃতা করেন তাদের ফটো দিয়ে বুলেটিন বাহির হয়। এই লোভটা অনেকেই সংবরণ করতে পারেন নাই। 

'আর আমার বক্তৃতা দেওয়া ছিল এই জন্য যে, বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিব'।" ( আমার দেখা নয়াচীন -শেখ মুজিবুর রহমান।পৃষ্ঠা- ৪৪)

এরপর ১৯৫৩ সালে দেশব্যাপি বৃহৎ পরিসরে প্রথম ভাষা শহীদ দিবস পালনের ডাক দেন তিনি, আর জনগণের সংগঠন বলতে আওয়ামীলীগই কেবল তখন শেখ মুজিবুর এঁর নেতৃত্বে উঠে দাঁড়াচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তিনি তাঁর সাংগঠনিক জেলাগুলোতে চিঠি দিলেন ভাষা শহীদ দিবস পালনের নির্দেশ দিয়ে। কালো পতাকা দেখানো হলো। আব্দুল ওয়াদুদ পাটোয়ারী, আতাউর রহমান, কাজী গোলাম মাহাবুব, শওকত আলী, প্রাওসু সমাদ্দার, সওহার আলী, খন্দকার মোস্তাক, গাজিউল হক, খন্দকার মোঃ ইলিয়াস (সম্পাদক- যুগের দাবী), প্রমুখসহ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৫/২০ হাজার মানুষের মিছিল আরমানিটোলা ময়দানে শেষ হলো, শেখ মুজিব বক্তৃতায় বললেন -'এটা আমাদের ভাষার দাবী নয়, এটা আমাদের বাঁচার দাবী।'  [Secret Document Of Intelligence Branch on Father Of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, vol-3, page- 86,87]

একটি প্রতিজ্ঞা জোরালো সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে উদিত হলো।

এভাবে দেখা যায় তিনি ১৯৫২-১৯৫৩ পুরো সময় ধরেই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিং, চাঁদপুর, চট্রগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দুর্বার সাংগাঠনিক সফর করেন, এবং সব জায়গাতেই তাঁর অন্যন্য বক্তব্যের সাথে সাথে শেষ কথা একটাই -ভাষা শহীদের রক্ত বৃথা হতে দেওয়া যাবে না। এবং তিনি এও বললেন পূর্ব বাংলায় উর্দুকে বয়কট করা হবে, যদি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া না হয়। মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তিনি জাগরণের শ্লোগান দিয়ে যেতে লাগলেন।   

এরকমটা চলতে থাকলে একপর্যায়ে ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে একটা চিঠি লিখলেন, চিঠিতে বাংলা ভাষা বিষয়ক অংশটুকু ছিল এরকম- 'Hence you can well realise that you are antagonising the whole of West Pakistan by demanding that Urdu should be boycotted, or that you will start Direct Action. I do not think that anybody has given you the authority to threaten such a serious course of conduct as direct action. Therefore, while you press your claims for Bengali, you must not attack Urdu.’ [Secret Document Of Intelligence Branch on Father Of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, vol-3, page- 390]

এধরনের অনেক বিষয় বঙ্গবন্ধু অনায়াসে পাশ কাটিয়ে লক্ষে স্থির থেকেছেন শেষ পর্যন্ত, নতুবা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যার প্রমাণ আমরা বাংলা ভাষার জন্য সোহরাওয়ার্দীর পরবর্তী সমর্থনে দেখতে পাই। 

একটি জাতির বেঁচে থাকার যুগ যুগের প্রবাহ হচ্ছে তাঁর ভাষা, বঙ্গবন্ধু তাঁর বাঙালি মানুষদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য হয়ত তিনি দৈনন্দিনভাবেই জীবিত ছিলেন বিশেষ মানুষ হিসেবে।

চাপিয়ে দেওয়া খোঁড়া ইসলামী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষাভিত্তিক বৃহৎ শোষিত বাঙালি মননে জাতীয়তাবাদ এর রাজনৈতিক স্ফুরণ ঘটিয়েছিলেন।

 তারও আগে, অর্থাৎ ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার আগে ও পরে অনেকেই যেমন আব্দুল হাকিম, ড. মোঃ শহিদুল্লাহ, প্রমথ চৌধুরী, হুমায়ুন কবির, মিজানুর রহমান, আব্দুল হক, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, মওলানা আকরাম খাঁ প্রভূত স্কলারগণ তাঁদের লেখায় মাতৃভাষা বাংলার উপযোগিতা, আবেগ, অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। 

এরকম আরো অনেকে বাংলা ভাষার প্রতি তাঁদের প্রেম সমর্পণ করেছেন, তখন রাজনৈতিক ভাবে নামমাত্র গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো যেমন গণ আজাদী লীগ, পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টি, কিংবা অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোও তাঁদের বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। জানা যায় বাংলা ভাষার সমর্থকরা ভারতভাগের পূর্বেই উর্দুর বিরোধিতা শুরু করেন, এবং ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষ্মৌ অধিবেশনে বাংলার সভ্যরা উর্দুকে ভারতের মুসলিমদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা মনোনয়নের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু আবার বিতর্কটি শুরু হয় যখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিশ্চিত হয়। 

৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। গাজীউল হক তাঁর ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করছিলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’ প্রস্তাবগুলো ছিল- ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ এভাবেই ভাষার দাবি বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল। 

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বাংলা ভাষার দাবির সপক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং সে সময়ের বিভিন্ন মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। জানা যায়, বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলাকালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অনুষ্ঠিত মিছিলে অংশগ্রহণ করেন এবং নেতৃত্বদান করেন। ।

এবং ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসেই ১৪জন সমকালীন নেতৃত্বদানকারী সর্বপ্রথম

এবং ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসেই ১৪জন সমকালীন নেতৃত্বদানকারী সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবিসংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেন। ওই ইশতেহারে ২১ দফা দাবির মধ্যে দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ঐতিহাসিক এই ইশতেহারটি একটি ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয় যার নাম দেওয়া হয় ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইশতেহার-ঐতিহাসিক দলিল।’ এই ইশতেহার প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন এর অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। 

সিক্রেট ডকুমেন্টের শুরুতে জানা যায়, -জানুয়ারি ১৩, ১৯৪৮ দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউজের সামনে কিছু অপরিচিত কর্মী শেখ মুজিবুর ও নইমুদ্দিন আহমেদের নাম সম্বলিত বুকলেট বিক্রি করছেন তাতে লেখা 'পূর্বব-পাকিস্তানে দুর্ভাগা জনসাধারণের কৈফিয়ত দিতে হবে আমাদের দাবী।' আরেক দল শ্লোগান দিচ্ছেন 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' 'আমাদের দাবী মানতে হবে।' [Secret Document Of Intelligence Branch on Father Of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, vol-1, page- 04]

এর আগে বঙ্গবন্ধু ৪ জানুয়ারি, ১৯৪৮ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন, সেখানে ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে তাঁর অন্যতম দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা।এক পর্যায়ে ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ছাত্রদের মধ্যে হৈচৈ শুরু হয়।

এরপর ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তমুদ্দিন মজলিসের আহ্বানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। জানা যায় এ ধর্মঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাহসী ভূমিকা রাখেন। ওইদিন মিছিলের সমগ্র ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। এরপর ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলে তমুদ্দিন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়।

তবুও এতো কিছুকে উপেক্ষা করে গোঁয়ার পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের অপরিনাম চিন্তার প্রশ্রয়ে বাঙালির প্রাণের ভাষাকে কেড়ে নিতেই চাইল, তাল বাহানা শুরু করল, কেড়ে নিতে চাইল হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত স্বপ্ন। 

আর ঠিক যেন এর বিপরীতে তখন প্রয়োজন ছিল দাঁতভাঙ্গা দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞার। কেননা এধরনের অসুখের জন্য রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা দ্রুত কাজ করে, কোন কোন ক্ষেত্রে এরকম দাওয়ায়ের কোন বিকল্প নাই। বঙ্গবন্ধু একটুও ছাড় দেননি তাঁর সাহসের সেইখানটিতে। 

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষার প্রশ্নে পূর্ব-বাংলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং ঢাকায় সর্বাত্মক ধর্মঘট পালনের সময় শেখ মুজিব সচিবালয়ের গেটের সামনে থেকে গ্রেফতার হলেন সে সময় তাঁর সাথে ছিলেন শামসুল হক, অলি আহাদ, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, রওশন আলম, রফিকুল আলম, আব্দুল লতিফ তালুকদার, শাহ্ মোঃ নাসিরুদ্দীন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ।  এর আগে তিনি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্যদের দিয়ে বাংলা ভাষার দাবীতে লিফলেট বিতরণ করিয়েছিলেন, ৪ মার্চ ১৯৪৮ একটা গোয়েন্দা তথ্যে তা উঠে আসে এরকমভাবে- 

‘I have the honour to report the particulars of the members of the provincial organising committee of East Pakistan Muslim Students League as follow. They were the signatories the leaflet which advocate Bengali to be the state language for Pakistan.

4. SK. Mujibur Rahman s/o SK. Lutfar Rahman of Tungipara, Faridpur. Student 1st Yr. B.L., Dacca University, attached to S.M Hall, at present ‪c/o Kamruddin Ahmed, 150 Moghultuli‬, Dacca.                                                                                                                        

[Secret Document Of Intelligence Branch on Father Of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, vol-1, page- 06]

তার আগেও বঙ্গবন্ধু ভারত-পাকিস্তান ভাগের আগে অর্থাৎ ১৯৪৮ এর আগে, বয়সে তরুণ হয়েও বাঙালি স্কলারদের লেখায় নৈতিক সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছেন নানাভাবে। ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েও বঙ্গবন্ধু দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

এবং ৫২ এর ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারির আগের রাত, সেদিন তিনি বন্দি অবস্থায় থেকেও হাসপাতাল থেকে গোপনে তাঁর সতীর্থদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরদিন ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি -সালাম, রফিক, বরকত, শফিউরসহ নাম না জানা আরো কয়েকজন গুলিতে উর্ধমুখি কৃষ্ণচূড়ার তলায় বাংলা ভাষার কোলে লুটিয়ে পড়ল। 

বঙ্গবন্ধু ভাষা শহীদদের এই মরণকে সাধারণ মরণ থেকে পৃথক করে তুললেন।

তিনি তাঁর প্রতিবাদে, বক্তৃতায়, শ্লোগানে, সাংগাঠনিক কর্তব্যে ভয়হীন হয়ে গেলেন, এবং বছরের পর বছরে ভাষা আন্দোলন হয়ে উঠল আপমর বাঙালির নিজের। ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন, ২৫শে আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অনেক কিছু বলার পর একপর্যায়ে বললেন- 'বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কি হবে?' 

১৯৫৬ সালে বাংলা ও উর্দুকে রাস্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।

এরপর, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর তিনি (বঙ্গবন্ধু) ২৫শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দেন।

---------- -------------------

১৯৫২ থেকে ১৯৯৯, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলো। 

১৯৫২ এর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেল।পৃথিবীর সকল মাতৃভাষা যেন মুক্তি পেল। এবং বছরের পর বছরে বঙ্গবন্ধুর সেই লালিত ভাষা আন্দোলন হয়ে উঠল বাঙালির আজন্ম গৌরবের। আজ বাঙালি তাঁর বাংলা ভাষায় যেমন পৃথিবীর বড় স্বপ্নটুকুও দেখতে পারে। 

আব্দুল্লাহ আল হাদী, 

কবি ও সাহিত্যিক।

২১ ফেব্রুয়ারি